” খাসতালুকেই মোদি নার্ভাস???

সুন্দরবন বললেই যেমন ভয়ংকর সুন্দর ডোরাকাটা দক্ষিণরায়ের ছবি ভেসে ওঠে, গুজরাট বললে তেমনই ভাসে নরেন্দ্র মোদির মুখ। প্রাসঙ্গিক থেকেও কীভাবে যেন ঝাপসা হয়ে গেছেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী অথবা বল্লভভাই প্যাটেল। রাজ্যে এখন একটাই নাম। একটাই মুখ। একটাই চরিত্র। নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি।

নিজের খাসতালুকে সেই মোদিকে আজ কি একটু নার্ভাস লাগছে? নইলে কেন তিনি বেছে বেছে শুধু সেই এলাকাগুলোয় যাচ্ছেন, যেগুলো মাত্র দেড় বছর আগে তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল?

দেড় বছর আগের ছবিটা তাহলে একটু মনে করিয়ে দেওয়া যাক। ২০১৭ সালের শেষাশেষি। গুজরাট বিধানসভার ভোট। হারানো জমি ফিরে পেতে কংগ্রেসের নতুন সভাপতি রাহুল গান্ধী রাজ্য চষে ফেলছেন। রাজ্যজুড়ে কৃষক-ক্ষোভের মেঘ। কৃষিজীবী পাতিদারদের আন্দোলন ঘুম কেড়েছে শাসক বিজেপির। সেই আন্দোলনের হার্দিক প্যাটেল নামের মধ্যে জুজু দেখছে শাসক দল। তাঁরই সঙ্গে জুড়েছেন আরও দুই যুবক। অনগ্রসর সম্প্রদায়ের নেতা অল্পেশ ঠাকোর ও দলিত সমাজের জিগ্নেশ মেওয়ানি। তিন তরুণ তুর্কি-নাচন নাচাচ্ছেন শাসক বিজেপিকে।

রাজ্য হারানোর আশঙ্কায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘাঁটি গেড়ে থাকলেন দিনের পর দিন। কানের পাশ দিয়ে তির বেরিয়ে যাওয়ার মতো সরকার রক্ষা হলো ঠিকই, কিন্তু সেই প্রথম বিজেপির আসন এক শ ছুঁতে পারল না। ভোট পর্যালোচনা দেখাল, গুজরাটের গ্রাম কংগ্রেসকে কাছে টেনেছে, শহর আঁকড়ে ধরেছে বিজেপিকে।

গ্রামের মানভঞ্জনে এবার মোদির নজর তাই সেই এলাকাগুলোয়, দেড় বছর আগে যারা কংগ্রেসকে আশ্রয় দিয়েছিল। গত সপ্তাহে সৌরাষ্ট্র ও দক্ষিণ গুজরাটে ঘুরে যাওয়ার পর গত বুধ ও গতকাল বৃহস্পতিবার মোদি চষে বেড়ালেন উত্তর ও মধ্য গুজরাট। বৃহস্পতিবার তিনি গেলেন আমরেলিতে, যে আসনটি ঘিরে এবার স্বপ্ন দেখছে কংগ্রেস।

বিধানসভা ভোটের ট্রেন্ড ঠিক থাকলে রাজ্যের ২৬টি আসনের মধ্যে কংগ্রেসের এবার পাওয়ার কথা ৮টি। উত্তর গুজরাটের বানসকাঁথা, সাবরকাঁথা, পাটান ও মেহসানা; মধ্য গুজরাটের আনন্দ এবং সৌরাষ্ট্রের আমরেলি, জুনাগড় ও সুরেন্দ্রনগর। কিন্তু পাওয়ার কথা হলেও পাবে কি? যুযুধান দুই শিবিরেই প্রশ্নটা ঘুরে বেড়াচ্ছে।

কংগ্রেস শিবিরে ঘুরছে, কারণ, ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে রাজ্যে একটা আসনেও কংগ্রেস জেতেনি। এবার তাই একটা আসন পেলেও তা যাবে পাওনার ঘরে। বিজেপির চিন্তা আসন ঘাটতির। তারা বুঝছে, তাদের লোকসান মানে কংগ্রেসের লাভ। মোদি তাই গুজরাটে এক ভিন্ন কৌশল নিয়েছেন। সুরেন্দ্রনগর, হিম্মতনগর, পাটান, আনন্দ, আমরেলিতে তাঁর ভাষণ আতশকাচের নিচে ধরেও নিরাপত্তা, পাকিস্তান, সন্ত্রাসবাদ, সার্জিক্যাল স্ট্রাইক বা বালাকোটের নামগন্ধ সেভাবে পাওয়া গেল না। হ্যাঁ, নিরাপত্তা বলতে যা পাওয়া গেল তা একধরনের সাবধানবাণী। রাজ্যবাসীকে তিনি মনে করিয়ে দিলেন, ২০১২ সালে কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকার মিথ্যা অভিযোগে অমিত শাহ ও রাজ্যের বড় পুলিশ কর্তাদের জেলে পুরেছিল। কাজেই কংগ্রেসের পক্ষে বোতাম টেপার অর্থ হলো, রাজ্য নেতাদের হয়রানি।

মোদির ভাষণে যা পাওয়া গেল তা কৃষক-তোষণ। কৃষকদের জন্য তাঁর সরকার কী করেছে, কী কী করবে, কীভাবে তাদের মুখের হাসি অমলিন রাখবে, সারাক্ষণ সেই ফিরিস্তি। এই ফিরিস্তিতে রাজ্যের চাষিরা আপ্লুত হলে বিধানসভার ভোটে এগিয়ে থাকা ৮ আসন জেতা কংগ্রেসের পক্ষে শুধু কঠিনই নয়, অসম্ভবও হয়ে দাঁড়াতে পারে।

রাহুল গান্ধীর বাবা রাজীব যাঁকে দিয়ে ভারতের প্রযুক্তিতে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন, সেই স্যাম পিত্রোদা এই গুজরাটের ভূমিপুত্র। গতকাল আহমেদাবাদে তিনি প্রথম আলোকে বললেন, ‘মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়াই সব সময় কঠিন। সেই মিথ্যা যখন দেশের প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে অনর্গল বের হয়, তখন তা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। প্রধানমন্ত্রীর অসত্য ভাষণ মানুষ সত্য বলেই ধরে নেয়।’

কীভাবে কংগ্রেস তাহলে ‘প্রধানমন্ত্রীর মিথ্যাচারের’ মোকাবিলা করছে? উত্তরে স্যাম পিত্রোদা কংগ্রেসের ইশতেহার তুলে বললেন, ‘জনতাকে বলছি, মিথ্যাকে বিশ্বাস না করে সত্যকে বিশ্বাস করুন। বলছি, আমরা ক্ষমতায় এলে ইশতেহার লাইন বাই লাইন রূপায়ণ করব। গরিব মানুষদের বছরে ৭২ হাজার টাকা দেব। সেটাই হবে প্রকৃত ন্যায়।’

গুজরাটি জাত্যভিমানের ধ্বজা উড়ছে। মোদি-শাহ জুটি দেড় বছর ধরে কংগ্রেসের পালের হাওয়াও একটু একটু করে কেড়ে নিয়েছেন। লড়াই অসম ও কঠিন। ভোটের মুখে দাঁড়িয়ে আজ বলা যেতেই পারে, গুজরাট কংগ্রেসের হাসি চওড়া করলে তা হবে অষ্টম আশ্চর্যের সমতুল্য।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*