সৌদিতে লাইভ সম্প্রচারে হঠাৎ ছোট পোশাকে নারী রেসলার, অতঃপর…

সৌদি আরবের টেলিভিশনে প্রথবারের মত লাইভ রেসলিং সম্প্রচারের সময়, হঠাৎ পর্দায় ছোট পোশাকে নারী রেসলারের উপস্থিতি দেখা যায়। আর এ ঘটনায় তাৎক্ষণিক দুঃখ প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ।

গতকাল ওয়ার্ল্ড রেসলিং এন্টারটেইনমেন্ট ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে জেদ্দায় এই ম্যাচ আয়োজন করেছিল। সৌদি আরব এবং ইরানের দুই দেশের প্রতিযোগী লড়েন ম্যাচটিতে। জিতেছেন অবশ্য সৌদি কুস্তিগির। দর্শক সারিতে নারী পুরুষ উভয়েই উপস্থিত ছিলেন, যদিও কোন নারী রেসলার লড়াইতে অংশ নেননি।

কিন্তু সমস্যা শুরু হয় অন্য জায়গায়। বিজ্ঞাপনের সময় সংক্ষিপ্ত পোশাক পড়া নারী রেসলারদের দেখানো শুরু হলে, সম্প্রচার বন্ধ করে দেয় রাষ্ট্রীয় টিভি। তবে কুস্তি চলাকালীন সময় অডিটোরিয়ামের বড় টিভি স্ক্রিনে সে দৃশ্য তৎক্ষণাৎ বন্ধ করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

ফলে রেসলিং অ্যারেনায় উপস্থিত সবাই সে দৃশ্য দেখতে পান। এই ‘অশ্লীল’ দৃশ্যের জন্য ক্ষমা চেয়েছে সৌদি জেনারেল স্পোর্টস কর্তৃপক্ষ। রেসলিং বা কুস্তি সৌদি আরবের সমাজের জন্য এক সময় প্রায় অপরিচিত একটি ব্যপার ছিল।

যদিও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে কুস্তি বা রেসলিং খুবই জনপ্রিয় একটি খেলা। গত বছর দুয়েক ধরে একটু একটু করে এ ধরণের বিনোদনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া হচ্ছে দেশটির সমাজকে।

দেশটির যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান দেশটির সমাজে যে পরিবর্তন আনার নানা উদ্যোগ নিয়েছেন, এটিও তারই অংশ। গতকালের ঐ ম্যাচ দেখার জন্য অডিটোরিয়ামে নারীসহ ৬০ হাজার মানুষ উপস্থিত ছিলেন

দেশটিতে নারীরা ইতিমধ্যেই ফুটবল খেলার অনুমতি পেয়েছেন। তবে এর আগে নারী রেসলারদের অংশগ্রহণের সুযোগ না রাখায় ওয়ার্ল্ড রেসলিং এন্টারটেইনমেন্টের সমালোচনা করেন অনেকে। আর ঐ ম্যাচটি নিয়ে দেশটির সামাজিক মাধ্যমে বেশ সরব ছিল।

ম্যাচ চলাকালে অডিটোরিয়ামের ভেতরে ইরানের পতাকা ওড়াতে দেখা গেলেও তাতে কর্তৃপক্ষ বাধা দেয়নি। অনেকে এই ব্যপারটির প্রশংসা করে পোষ্ট দিয়েছেন।

মিয়ানমারের অন্য মুসলমানরা কেমন আছেন…?

গত ২৫ শে আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর দেশটির সেনা অভিযানের পর থেকেই তাদের জীবনে দুর্বিষহ বিপর্যয় নেমে আসে। বদলে যেতে থাকে গোটা রাখাইনসহ মিয়ানমারের মুসলিমদের জীবন।বিভিন্ন সূত্র হতে জানা যায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এ অভিযানে রাখাইনে প্রায় চার হাজারের অধিক নিহত এবং প্রায় ছয় লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশের কক্সবাজার-বান্দরবনে আশ্র্রয় নেয়।

এই অবস্থায় রাখাইনে সহিংসতা শুরু হওয়ার পর মিয়ানমারের ভেতরের অবস্থা দেখতে সেখানে গিয়েছিলেন বিবিসি সংবাদদাতা আনবারাসান এথিরাজন। রোহিঙ্গা নন এমন মুসলমানদের পরিস্থিতি বুঝতে তিনি কথা বলেছেন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে। দেশটির সবচেয়ে বড় শহর ইয়াঙ্গুন থেকে তার পাঠানো রিপোর্ট সরাসরি তুলে ধরা হলো এখানে-

মিয়ানমারের নাগরিক তুন চি। এই দেশে তিনি জন্মেছেন, বড় হয়েছেন। অন্য হাজারো বার্মিজদের মতো মিলিটারি জান্তার বিরুদ্ধে তিনিও রাস্তায় আন্দোলন করেছেন গণতন্ত্রের দাবিতে। দশ বছর তিনি কারাগারেও কাটিয়েছেন। আজ তিনি মিয়ানমারের সাবেক রাজবন্দী পরিষদে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।

তিনি ঐসব মুসলমানদের একজন, যারা আশা করেন যে ২০১০ সালে সেনা-শাসনের অবসানের পর মুসলমানরা সমাজে তাদের যথাযথ অবস্থান ফিরে পাবে। তিনি বলেন, ২০১২ সালে রাখাইনে সহিংসতার পরই পরিস্থিতি পাল্টে যায়।কেবল রোহিঙ্গা মুসলিমরাই উল্টো স্রোতের মুখোমুখি হয়েছেন এমন নয়, পুরো বার্মার মুসলমান সম্প্রদায়ই আসলে এই সমস্যার মধ্যে পড়ে গেছেন। চি’র পূর্বপুরুষরা এক সময় ভারত থেকে বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারে এসেছিলেন। এসেছিলেন অনেক পুরুষ আগে, তখন দেশটি বার্মা নামে পরিচিত ছিল।

২০১২ সালে পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন প্রদেশে বৌদ্ধ আর রোহিঙ্গা মুসলমানদের মধ্যে সংঘর্ষের পর এক লক্ষ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। বেশিরভাগ বাস্তুচ্যুত, বিশেষ করে রোহিঙ্গা মুসলমানরা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে আশ্রয় নেন।বিবিসি সংবাদদাতা এথিরাজন বলেন, ইয়াঙ্গনের একটি মসজিদে এক শুক্রবার আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হলো। আমি দেখলাম শতশত পুরুষ মসজিদে ঢুকছে। অনেকের মাথায় টুপি, তারা নামাজের জন্য তৈরি হচ্ছেন। প্রার্থনার জন্য আসা অনেকের সঙ্গে আলাপে এটা পরিষ্কার বুঝতে পারলাম রাখাইনে যা ঘটছে তা নিয়ে এই সম্প্রদায়ের মানুষ কতটা অস্বস্তিতে আছে।

রোহিঙ্গা মুসলিম জঙ্গি গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা আরসা ২৫শে অগাস্টে রাখাইন অঞ্চলে মিয়ানমারের নিরাপত্তা চৌকিতে একযোগে হামলা করার পর সেখানে সহিংসতা শুরু হয়।জবাবে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী পাল্টা ব্যবস্থা নেয়, যাকে তারা বলছে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান। এরপর পাঁচ লক্ষেরও বেশী রোহিঙ্গা মুসলিম সেখান থেকে পালিয়ে বাঁচে – একই সঙ্গে উঠে আসে সম্ভ্রমহানী আর বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সব খবরাখবর।

রোহিঙ্গাদের এই পালিয়ে বাঁচাকে জাতিসংঘের সিনিয়র কর্মকর্তা এবং মানবাধিকার কর্মীরা বর্ণনা করেছেন “জাতিগত নিধন” হিসেবে- তবে মিয়ানমারের সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বিবিসি’ সংবাদদাতা এথিরাজন বলেন, রাখাইন রাজ্যের সমস্যা খুবই ভয়ঙ্কর, নামাজ পড়তে আসা মুহাম্মদ ইউনুস আমাকে ফিসফিস করে বললেন।এমন উদ্বেগও আছে যে সহিংসতা ইয়াঙ্গুন এবং অন্যান্য এলাকাতেও ছড়াতে পারে। ইউনুস বলেন, দেশের অন্য এলাকার মুসলমানরা কী বলছেন কিংবা প্রতিদিন কী ধরণের কাজ করছেন- এসব নিয়ে খুব সাবধানী হয়েছেন।

ইউনুস সংবাদদাতা এথিরাজনকে আরও জানান, রাখাইনে জন্ম নিয়েছেন আর বড় হয়েছেন এমন অনেক মানুষ এখন ইয়াঙ্গনে বাস করছেন। তবে তারা তাদের পরিবারের সদস্য আর আত্মীয়দের নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।ধারণা করা হয় যে মিয়ানমারের পাঁচ কোটি ৩০ লক্ষ বাসিন্দার মধ্যে ৪.৫ শতাংশ মুসলমান। রোহিঙ্গাদের ধরেই এই হিসাব। তবে মুসলিম নেতারা এমন যুক্তি দেন যে তাদের আসল সংখ্যা সরকারি হিসাবের দ্বিগুণের মতো হতে পারে।

অনেক রিপোর্টে বলা হয় যে মুসলমানরা মিয়ানমারে শতশত বছর ধরে বাস করছেন। ব্রিটিশ শাসনের সময় তাদের সংখ্যা বাড়ে, কারণ সে সময় অনেকে দেশটিতে অভিবাসী হয় কিংবা তাদেরকে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে নিয়ে আসা হয়।রোহিঙ্গা মুসলমানদের ভাষা দক্ষিণ এবং কেন্দ্রীয় মিয়ানমারে বাস করা মুসলমানদের থেকে আলাদা। আর রোহিঙ্গাদের বেশীরভাগেরই বসবাস রাখাইন রাজ্যে। মুসলমান নেতারা বলছেন, তাদের জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশ বড় হলেও পার্লামেন্টে মুসলিম কোন সদস্য নেই, আর এই কারণে তারা হতাশ।

২০১৫ সালের নির্বাচনের পর অং সান সু চি’র দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) ক্ষমতায় আসে। কিন্তু এই দলও নির্বাচনে কোন মুসলিম প্রার্থী দেয়নি। “আমরা অনুভব করি সব রকমভাবেই আমরা বৈষম্যে শিকার হচ্ছি,” বললেন আলহাজ্ব উ আয়ে লিউইন, যিনি ইসলামিক সেন্টার অব মিয়ানমারের মুখ্য আহবায়ক।

তিনি বলেন, ১৯৬২ সালে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করার পর থেকেই এই অবস্থা চলছে এবং তখন থেকেই গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদ হতে মুসলমানদের সরিয়ে দেয়া শুরু হয়। “আপনি এখন পুলিশ বাহিনীতে এমনকি একজন জুনিয়র (মুসলিম) কর্মকর্তা খুঁজে পাবেন না- সেনাবাহিনী তো অনেক দূরের কথা,” জানান লিউইন।তিনি যুক্তি দেন যে সরকার থেকেই বৈষম্যের ঘটনা বেশী হচ্ছে এবং একেবারে নিচু পর্যায়ে এটা এতো বিস্তৃত নয়। সাবেক জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে যে স্বাধীন উপদেষ্টা কমিশন গঠন করা হয়েছিল, তার একজন সদস্য হলেন মি. লিউইন।রাখাইন রাজ্যে বিরোধের সমাধান খুঁজে বের করতে এই কমিশন গঠন করা হয়েছিল। অং সান সু চি ২০১৬ সালে এই কমিশন গঠন করেন। সর্বশেষ দফার সহিংসতা শুরুর একদিন আগে, অর্থাৎ ২৪শে অগাস্ট কমিশন তাদের সুপারিশ পেশ করে।

মি. লিউইন বলেন, সু চি হয়তো নিখুঁত নন, কিন্তু “তিনিই আমাদের একমাত্র আশা”। এই মুসলিম নেতার যুক্তি হলো, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে তার পক্ষে যতটুকু করা সম্ভব, মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর ততটুকু করেছেন। “তিনি যদি খোলামেলাভাবে মুসলমানদের পক্ষে কথা বলা শুরু করেন, তবে তা হবে তার জন্য রাজনৈতিকভাবে আত্মহত্যা করার শামিল,” মি. লিউইন বলেন। “আমরা চাইনা যে সেটা ঘটুক। ”

তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে পশ্চিমা বিশ্বের এটা বুঝতে হবে তাকে নিন্দিত করে ক্ষমতা থেকে সরালে মিয়ানমার আবারও কর্তৃত্ববাদী শাসনে ফিরে যেতে পারে। “তখন কেবলমাত্র একনায়কেরাই ফিরে আসবে,” সাবধান করে দিলেন তিনি। বিবিসি।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*